০৮:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

২৬ বছরেও কাগজে-কলমে ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র ; অবকাঠামোহীনতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
  • / ৩৩

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

মমিনুল ইসলাম:

এক সময় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল মেঘনা নদীর পাড়ঘেঁষা চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ষাটনল হবে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় নদীভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র। ২০০০ সালে সরকারি ঘোষণার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৬ বছর। কিন্তু বাস্তবে আজও উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি সম্ভাবনাময় এই পর্যটন এলাকা। আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবার অভাবে দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রটি মেঘনা নদীর পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চ, ট্রলার কিংবা সড়কপথে সহজেই এখানে আসা যায়। প্রতিদিন পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা শিক্ষার্থীদের দল নদীর পাড়ে সময় কাটাতে, বনভোজন করতে কিংবা নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে এখানে ভিড় করেন।

কিন্তু পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, আধুনিক বিশ্রামাগার, মানসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা নজরদারি। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করে অনিরাপদ পরিবেশ। অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন কেন্দ্র এখন অবহেলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সোলাইমান বলেন, জায়গাটা সত্যিই অনেক সুন্দর। কিন্তু সন্ধ্যার পর কিছু সন্দেহজনক মানুষের আনাগোনা দেখে ভয় লাগছিল। নিরাপত্তা আর ভালো পরিবেশ থাকলে এটা খুব দ্রুত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আলম বলেন, এখানে নদী দেখা আর নৌকাভ্রমণ ছাড়া তেমন কিছু নেই। ভালো খাবার দোকান, রেস্ট হাউজ, পার্কিং আর নিরাপত্তা থাকলে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ত।

কলেজ শিক্ষার্থী বেনজির হোসেন বলেন, বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই আসি। কিন্তু বসার ভালো জায়গা নেই, কোনো পার্ক নেই। উন্নয়ন হলে তরুণদের জন্য এটা দারুণ একটা স্পট হতে পারত।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং সরকারি পর্যটন কেন্দ্রের পাশেই ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠেছে “জল বিলাস” নামে একটি রেস্টুরেন্ট। এখন অধিকাংশ দর্শনার্থী সরকারি পর্যটন এলাকায় সময় না কাটিয়ে ওই রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক অবস্থান করেই ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র শুধু মতলব উত্তর নয়, পুরো চাঁদপুর জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, কৃষিপণ্যের বাজার বাড়বে এবং এলাকার জমির মূল্যও বৃদ্ধি পাবে।

মতলব উত্তর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ফারুক হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘোষণার পর ঘোষণায় ২৬ বছর পার হয়ে গেলেও ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রের কোনো বাস্তব উন্নয়ন হয়নি। এটি এখন পর্যটনের নামে অবহেলার জ্বলন্ত উদাহরণ। নেই ন্যূনতম অবকাঠামো, নেই নিরাপত্তা, নেই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণেই সম্ভাবনাময় এই কেন্দ্রটি ধ্বংসের মুখে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ষাটনল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম সরকার বলেন, পর্যটন কেন্দ্রটির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিশুদের খেলার মাঠ, পার্কিং, রেস্ট শেডসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র কে আধুনিক, মানসম্মত এবং নিরাপদ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে দ্রুত প্রস্তাব পাঠানোর তৈরি করা হয়েছে। এখানে আধুনিক রেস্ট হাউস, উন্নত স্যানিটেশন এবং পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলে এখানে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য ও হস্তশিল্পের প্রসার ঘটবে, যা আমাদের উপজেলার সামগ্রিক জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

​তিনি আরও বলেন, সরকার এবং উপজেলা প্রশাসন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়া সম্ভব নয়। আমি এলাকার সকল সচেতন নাগরিক এবং সুধী সমাজকে অনুরোধ করব, আপনারা পর্যটকদের সাথে সদাচরণ করবেন এবং এই পর্যটন কেন্দ্রের সম্পদ রক্ষায় সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপন

সাবধান
এই পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু কপি করতে পারবেন না

২৬ বছরেও কাগজে-কলমে ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র ; অবকাঠামোহীনতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা

আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

মমিনুল ইসলাম:

এক সময় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল মেঘনা নদীর পাড়ঘেঁষা চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ষাটনল হবে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় নদীভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র। ২০০০ সালে সরকারি ঘোষণার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৬ বছর। কিন্তু বাস্তবে আজও উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি সম্ভাবনাময় এই পর্যটন এলাকা। আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবার অভাবে দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রটি মেঘনা নদীর পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চ, ট্রলার কিংবা সড়কপথে সহজেই এখানে আসা যায়। প্রতিদিন পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা শিক্ষার্থীদের দল নদীর পাড়ে সময় কাটাতে, বনভোজন করতে কিংবা নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে এখানে ভিড় করেন।

কিন্তু পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, আধুনিক বিশ্রামাগার, মানসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা নজরদারি। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করে অনিরাপদ পরিবেশ। অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন কেন্দ্র এখন অবহেলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সোলাইমান বলেন, জায়গাটা সত্যিই অনেক সুন্দর। কিন্তু সন্ধ্যার পর কিছু সন্দেহজনক মানুষের আনাগোনা দেখে ভয় লাগছিল। নিরাপত্তা আর ভালো পরিবেশ থাকলে এটা খুব দ্রুত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আলম বলেন, এখানে নদী দেখা আর নৌকাভ্রমণ ছাড়া তেমন কিছু নেই। ভালো খাবার দোকান, রেস্ট হাউজ, পার্কিং আর নিরাপত্তা থাকলে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ত।

কলেজ শিক্ষার্থী বেনজির হোসেন বলেন, বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই আসি। কিন্তু বসার ভালো জায়গা নেই, কোনো পার্ক নেই। উন্নয়ন হলে তরুণদের জন্য এটা দারুণ একটা স্পট হতে পারত।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং সরকারি পর্যটন কেন্দ্রের পাশেই ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠেছে “জল বিলাস” নামে একটি রেস্টুরেন্ট। এখন অধিকাংশ দর্শনার্থী সরকারি পর্যটন এলাকায় সময় না কাটিয়ে ওই রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক অবস্থান করেই ফিরে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র শুধু মতলব উত্তর নয়, পুরো চাঁদপুর জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, কৃষিপণ্যের বাজার বাড়বে এবং এলাকার জমির মূল্যও বৃদ্ধি পাবে।

মতলব উত্তর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ফারুক হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘোষণার পর ঘোষণায় ২৬ বছর পার হয়ে গেলেও ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রের কোনো বাস্তব উন্নয়ন হয়নি। এটি এখন পর্যটনের নামে অবহেলার জ্বলন্ত উদাহরণ। নেই ন্যূনতম অবকাঠামো, নেই নিরাপত্তা, নেই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণেই সম্ভাবনাময় এই কেন্দ্রটি ধ্বংসের মুখে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

ষাটনল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম সরকার বলেন, পর্যটন কেন্দ্রটির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিশুদের খেলার মাঠ, পার্কিং, রেস্ট শেডসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র কে আধুনিক, মানসম্মত এবং নিরাপদ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে দ্রুত প্রস্তাব পাঠানোর তৈরি করা হয়েছে। এখানে আধুনিক রেস্ট হাউস, উন্নত স্যানিটেশন এবং পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ষাটনল পর্যটন কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলে এখানে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য ও হস্তশিল্পের প্রসার ঘটবে, যা আমাদের উপজেলার সামগ্রিক জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

​তিনি আরও বলেন, সরকার এবং উপজেলা প্রশাসন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়া সম্ভব নয়। আমি এলাকার সকল সচেতন নাগরিক এবং সুধী সমাজকে অনুরোধ করব, আপনারা পর্যটকদের সাথে সদাচরণ করবেন এবং এই পর্যটন কেন্দ্রের সম্পদ রক্ষায় সজাগ দৃষ্টি রাখবেন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন