স্বাস্থ্য কর্মকর্তাই জানেন না জরুরি সেবার নম্বর, মতলব উত্তরে ‘মুঠোফোন স্বাস্থ্যসেবা’ কার্যত অচল
- আপডেট সময় : ০৬:০৯:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
- / ১৮

মমিনুল ইসলাম:
মানুষের দোরগোড়ায় জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার ২০০৯ সাল থেকেই দেশের জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চালু করেছে “মুঠোফোনে স্বাস্থ্যসেবা” কার্যক্রম। কিন্তু চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় সেই সেবা এখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস নিজেই জানেন না, তার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন একটি সেবা চালু রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষের জন্য চালু থাকা এই জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যেও নেই প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও কার্যকর তদারকি। ফলে সরকারি এই উদ্যোগ এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারের দেওয়া জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মোবাইল নম্বর ০১৭৩০-৩২৪৮৩৫। নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা এই নম্বরে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক জনগণকে স্বাস্থ্য পরামর্শ ও জরুরি সেবা দেওয়ার কথা। এছাড়া নম্বরটি হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানিয়ে রাখা এবং জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের নির্দেশনাও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। হাসপাতালজুড়ে কোথাও চোখে পড়েনি এই সেবার কোনো প্রচারণা। উপজেলার ঘনিয়ারপাড়, ছেংগারচর, ফরাজীকান্দি, একলাশপুর, মোহনপুর, ষাটনল, বাগানবাড়ি ও চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মোবাইল ফোনে ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, আমাদের এখানে যদি এ ধরনের মোবাইলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা যেত, তাহলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হতো।
তার এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, যে কর্মকর্তা নিজেই জানেন না তার হাসপাতালে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।
হাসপাতালের একাধিক স্টাফ জানান, মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালুর পর থেকেই এই কার্যক্রম সংযুক্ত রয়েছে। তবে এটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের কাজেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে এই সেবা সংক্রান্ত রেজিস্টার দেখতে চাওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ সেটি দেখাতে পারেননি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ফোনকল ও পরামর্শের তথ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা রেজিস্টার থাকার কথা।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারের জনবান্ধব এই উদ্যোগকে কার্যকর করতে দ্রুত প্রচারণা বাড়ানো, হাসপাতালের দৃশ্যমান স্থানে নম্বর প্রদর্শন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় কোটি টাকার স্বাস্থ্য উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কোনো উপকারেই আসবে না।
এ বিষয়ে হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, ইমার্জেন্সিতে দায়িত্ব পালনকালে স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য কোনো ফোনকল তারা পাননি। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন যেখানে মানুষই জানে না এমন সেবা আছে, সেখানে ফোন করবে কীভাবে?
উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও ফরাজীকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল গনি তপাদার বলেন, মোবাইল ফোনে যদি হাসপাতাল থেকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যেত, তাহলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে রাতের বেলায় অনেক উপকৃত হতো। কিন্তু এ ধরনের কোনো সেবা যে আছে, সেটাই তো জানতাম না।
ছেংগারচর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেনজির আহমেদ মুন্সি বলেন, উপজেলা হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা চালু কোনো জরুরি মোবাইল নম্বর থাকলে সেটি প্রচার হওয়া দরকার ছিল। আমরা শিক্ষকরাও জানি না এমন কোনো সেবা আছে।
এদিকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, চাঁদপুরের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই মুঠোফোনে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এটি সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটি উদ্যোগ।


























