১২:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

মা-বাবার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৬:২৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
  • / ৩৪

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রতিদিনের নিউজ:

রাজধানীর মিরপুরে একা বসবাসরত দুই মায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও সামনে এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’, যেখানে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত না করলে সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে গত ৩১ মে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, তার ছেলে যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান এবং অন্য ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরই মধ্যে আনিসুর রহমানকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনার আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই একই এলাকার আরেক বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ। মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের একটি বাড়িতে একা বসবাস করতেন তিনি। স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তার স্বামী ও সন্তানরা কানাডায় থাকেন। কয়েক দিন আগে তার মৃত্যু হলেও কেউ তা বুঝতে পারেনি।

পরপর দুটি ঘটনা সামনে আসার পর ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করা এবং আলাদা থাকলে নিয়মিত সাক্ষাৎ করার বাধ্যবাধকতাও আইনে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া কোনো সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাসে বাধ্য করতে পারবে না। পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে সন্তানদের আয়-রোজগার থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত প্রদান করার কথাও আইনে বলা হয়েছে।

আইনের ৪ ধারায় পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও সন্তানের ওপর বর্তায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, পিতা-মাতার ভরণপোষণসংক্রান্ত কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সংশ্লিষ্ট সন্তানকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

শুধু সন্তানই নয়, সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণপোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও একই শাস্তির বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য। তবে পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত কোনো মামলা আমলে নিতে পারবেন না। অভিযোগের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হবে।

তবে আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়নের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত না করার অভিযোগে মামলা ও শাস্তির ঘটনা খুবই সীমিত।

এরপর ২০২৩ সালে ৩১ মে এই আইনের অধীনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিধিমালা করা হয়। বিধিমালায় আদালতে মামলা দায়ের, নোটিশ জারি ও অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবীণ মা-বাবারা অধিকাংশ সময় সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও অনাগ্রহী থাকেন। সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং সন্তানদের প্রতি আবেগের কারণে অনেকেই আইনের আশ্রয় নেন না। ফলে আইনটি অনেকাংশে কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের প্রবীণ সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে একাকীত্ব, অবহেলা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছেন। পরিবারে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রবীণদের প্রতি যত্ন ও খোঁজখবর নেওয়ার সংস্কৃতিও ক্রমশ কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মিরপুরে নুরজাহান বেগম ও সেলিনা আফরোজের একাকী মৃত্যুর ঘটনাকে অনেকে শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সমাজে পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের সংকটের প্রতীক হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, প্রবীণদের সুরক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাও জোরদার করতে হবে। তা না হলে একাকি ও অবহেলিত অবস্থায় প্রবীণদের মৃত্যুর এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

 


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপন

সাবধান
এই পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু কপি করতে পারবেন না

মা-বাবার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

আপডেট সময় : ০৬:২৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রতিদিনের নিউজ:

রাজধানীর মিরপুরে একা বসবাসরত দুই মায়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও সামনে এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’, যেখানে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত না করলে সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে গত ৩১ মে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, তার ছেলে যুগ্ম-সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান এবং অন্য ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরই মধ্যে আনিসুর রহমানকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনার আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই একই এলাকার আরেক বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ। মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের একটি বাড়িতে একা বসবাস করতেন তিনি। স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তার স্বামী ও সন্তানরা কানাডায় থাকেন। কয়েক দিন আগে তার মৃত্যু হলেও কেউ তা বুঝতে পারেনি।

পরপর দুটি ঘটনা সামনে আসার পর ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করা এবং আলাদা থাকলে নিয়মিত সাক্ষাৎ করার বাধ্যবাধকতাও আইনে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া কোনো সন্তান তার পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাসে বাধ্য করতে পারবে না। পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে সন্তানদের আয়-রোজগার থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত প্রদান করার কথাও আইনে বলা হয়েছে।

আইনের ৪ ধারায় পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও সন্তানের ওপর বর্তায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, পিতা-মাতার ভরণপোষণসংক্রান্ত কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সংশ্লিষ্ট সন্তানকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

শুধু সন্তানই নয়, সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র-কন্যা কিংবা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণপোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও একই শাস্তির বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য। তবে পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত কোনো মামলা আমলে নিতে পারবেন না। অভিযোগের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হবে।

তবে আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়নের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত না করার অভিযোগে মামলা ও শাস্তির ঘটনা খুবই সীমিত।

এরপর ২০২৩ সালে ৩১ মে এই আইনের অধীনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিধিমালা করা হয়। বিধিমালায় আদালতে মামলা দায়ের, নোটিশ জারি ও অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবীণ মা-বাবারা অধিকাংশ সময় সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও অনাগ্রহী থাকেন। সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং সন্তানদের প্রতি আবেগের কারণে অনেকেই আইনের আশ্রয় নেন না। ফলে আইনটি অনেকাংশে কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

একই সঙ্গে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের প্রবীণ সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে একাকীত্ব, অবহেলা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছেন। পরিবারে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রবীণদের প্রতি যত্ন ও খোঁজখবর নেওয়ার সংস্কৃতিও ক্রমশ কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মিরপুরে নুরজাহান বেগম ও সেলিনা আফরোজের একাকী মৃত্যুর ঘটনাকে অনেকে শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সমাজে পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের সংকটের প্রতীক হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, প্রবীণদের সুরক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাও জোরদার করতে হবে। তা না হলে একাকি ও অবহেলিত অবস্থায় প্রবীণদের মৃত্যুর এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

 


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন