১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
উপ-সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগে সচেতনতা পরে শাস্তি, নামমাত্র প্রচারণা দিয়ে জরিমানা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৮:১০:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২১

.আফজাল হোসেন চাঁদ

দেশের বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন শুধু সরকারের কোনো দপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহারের ওপর অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সাধারণ নাগরিককে দৈনন্দিন জীবন প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার যখন কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করে, তখন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষকে সিদ্ধান্তটি জানানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বিধিনিষেধ কার্যকর করার আগে মানুষকে তা জানার সুযোগ দেওয়া ন্যায়সংগত প্রশাসনের মৌলিক শর্ত। বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখার ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের স্মারক অনুযায়ী বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। একই নির্দেশনায় সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা এবং বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বা অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ রাখার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ঔষধের দোকানসহ কিছু প্রতিষ্ঠান এ সময়সীমার আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। স্মারকটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানোর পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের কাছেও বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের আগে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো সাধারণ নাগরিককে কতটা জানাচ্ছে? দোকানদার, মার্কেট মালিক, ব্যবসায়ী, অনুষ্ঠান আয়োজক কিংবা পথচারী তারা কি স্পষ্টভাবে জানতে পারছেন কোন প্রতিষ্ঠান কখন খোলা রাখা যাবে, কোন আলোকসজ্জা কখন বন্ধ করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান এই বিধিনিষেধের বাইরে? যদি কোনো এলাকায় শুধু একটি মাইকিং, একটি ছোট নোটিশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে প্রচারণার দায়িত্ব শেষ করা হয়, তাহলে সেটিকে ব্যাপক জনসচেতনতা বলা কঠিন। আইন বা সরকারি নির্দেশনা মানা নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু নির্দেশনা সম্পর্কে জানানোও প্রশাসনের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্ত এমন হওয়া উচিত নয় যে, মানুষ না জেনে বা পর্যাপ্তভাবে না বুঝে সেটির লঙ্ঘন করবে এবং পরে শাস্তির মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক প্রতিদিনের কাজের সময়সূচি, কর্মচারীদের দায়িত্ব, পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা এবং আর্থিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। তাদের জন্য নতুন সময়সূচি কার্যকর হলে পর্যাপ্ত পূর্বঘোষণা, লিখিত নির্দেশনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলে প্রশাসন প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতেই পারে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত যেন জনসচেতনতার বিকল্প না হয়ে যায় এটাই গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিয়ম মানানো, রাজস্ব আদায় বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়। কোনো ব্যবসায়ী যদি স্পষ্টভাবে জানেন যে রাত ৮টার পর দোকান খোলা রাখা যাবে না, তার প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনাটি পৌঁছেছে, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার প্রচার হয়েছে এবং তিনি জেনেশুনে তা অমান্য করেছেন, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে। কিন্তু একজন দোকানদার যদি বাস্তবে নির্দেশনাটি জানেনই না, তার এলাকায় কার্যকর প্রচার না হয়ে থাকে, কিংবা নির্দেশনার ব্যতিক্রমগুলো পরিষ্কার না থাকে, তাহলে সরাসরি জরিমানার আগে তাকে সতর্ক করা ও নিয়মটি বুঝিয়ে দেওয়াই অধিক ন্যায়সংগত পদ্ধতি। কারণ প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বোধের সমন্বয় না থাকলে একটি ভালো উদ্যোগও নাগরিককের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মতো জাতীয় স্বার্থের বিষয়কে কেন্দ্র করে জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। মানুষ যদি মনে করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা মানানোর চেয়ে জরিমানা করাই বড় উদ্দেশ্য, তাহলে উদ্যোগটির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসন যদি প্রথমে বোঝায়, পরে পর্যবেক্ষণ করে এবং সর্বশেষে ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে জনগণের সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি সমন্বিত প্রচারণা পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। জেলার প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিস, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা, বাজার কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরকে একই ভাষায় নির্দেশনার সারসংক্ষেপ প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে বাজারে মাইকিং, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার, দোকানের সামনে ছোট নোটিশ, স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল পেজে সব মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু শহরের বড় মার্কেট নয়, উপজেলা সদর, ইউনিয়ন বাজার এবং গ্রামীণ হাটেও প্রচারণা পৌঁছাতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দায়িত্ব শুধু শহরের ব্যবসায়ীদের নয়। প্রচারণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্দেশনার ভাষা সহজ করা। শুধু স্মারক নম্বর, সরকারি ভাষা কিংবা জটিল বাক্য প্রচার করলে সাধারণ মানুষ পুরো বিষয়টি বুঝতে নাও পারেন। কোথায় কখন দোকান বন্ধ হবে, কখন আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ হবে, আলোকসজ্জা কখন বন্ধ হবে, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কখন শেষ করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান গুলো এই সময়সীমার বাইরে এসব বিষয় তালিকা আকারে সহজ ভাষায় জানানো দরকার। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সমিতি ও মার্কেট কমিটির নেতাদের নিয়ে সভা করে নির্দেশনার ব্যাখ্যা দিতে হবে।

বিশেষ করে বাজার ও মার্কেট এলাকায় একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রতিটি মার্কেটের প্রবেশপথে বড় অক্ষরে সময়সূচি টানিয়ে দেওয়া, দোকান মালিকদের লিখিতভাবে জানানো এবং বাজার কমিটির মাধ্যমে প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে একজন ব্যবসায়ী ভুলবশত নিয়ম ভাঙার সুযোগও কম পাবেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও জানতে পারবেন যে প্রচারণা সত্যিই হয়েছে কি না। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার নির্দেশনার ব্যতিক্রম। দপ্তরের প্রকাশিত সরকারি স্মারকে খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ঔষধের দোকানসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিককের কাছে যদি এই ব্যতিক্রমগুলো স্পষ্ট না থাকে, তাহলে একদিকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যেও ব্যাখ্যার ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। তাই বাস্তবায়নের আগে প্রত্যেক এলাকায় লিখিত ও মৌখিকভাবে ব্যতিক্রমগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা যত কম হবে, বিরোধ ও অভিযোগও তত কম হবে। একই সঙ্গে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ছোট দোকান, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাধারণ ব্যবসায়ী সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে। একজন ছোট দোকানদারকে জরিমানা করে পাশের বড় প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের লঙ্ঘন উপেক্ষা করা হলে মানুষের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় যদি সত্যিই জাতীয় স্বার্থের কর্মসূচি হয়, তাহলে এর বাস্তবায়নও হতে হবে বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে আরও একটি ধাপ যুক্ত করা যেতে পারে প্রথম পর্যায়ে সচেতনতা ও সতর্কীকরণ, দ্বিতীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ, তৃতীয় পর্যায়ে ইচ্ছাকৃত ও পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট আইনে যদি সরাসরি শাস্তির বিধান বা ভিন্ন প্রক্রিয়া নির্ধারিত থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবশ্যই সেই আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনস্বার্থ, বাস্তব পরিস্থিতি ও মানুষের জানার সুযোগকে বিবেচনায় নেওয়া প্রশাসনিক ভাবে দায়িত্বশীল আচরণ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জনগণকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বরং জনগণকে অংশীদার করতে হবে। একজন দোকানদারকে বলা যেতে পারে আপনি সময়মতো দোকান বন্ধ করলে শুধু সরকারি নির্দেশনা মানছেন না, জাতীয় সম্পদ সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখছেন। একজন মার্কেট মালিককে বোঝানো যেতে পারে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি আপনার প্রতিষ্ঠানের খরচও কমতে পারে। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজককে জানানো যেতে পারে নির্ধারিত সময় মেনে অনুষ্ঠান শেষ করাও জাতীয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচির অংশ। এই ইতিবাচক বার্তা নাগরিককের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রচার ও প্রয়োগ দুটিই প্রয়োজন। শুধু প্রচারণা করে নিয়ম ভঙ্গকারীদের ছাড় দেওয়া যেমন কার্যকর নয়, তেমনি প্রচারণা দুর্বল রেখে জরিমানা করা জনআস্থার জন্যও ভালো নয়। প্রশাসনের শক্তি শুধু জরিমানা করার ক্ষমতায় নয়, মানুষকে নিয়ম মানাতে সক্ষম হওয়ার মধ্যেই প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্য।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্দেশনা জারির পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত স্থানীয় গণমাধ্যমকে তা সরবরাহ করা এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সময়সূচি, ব্যতিক্রম ও কার্যকর হওয়ার তারিখ বারবার জানানো গেলে নাগরিককে মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে। শুধু নির্দেশনার কপি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে মাঠপর্যায়ে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যটিও জনগণকে বুঝিয়ে বলা দরকার। মানুষ যদি শুধু শোনে ‘রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হবে, তাহলে সেটি তার কাছে আরেকটি প্রশাসনিক বিধিনিষেধ মনে হতে পারে। কিন্তু যদি বোঝানো হয় যে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বাণিজ্যিক বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানোই মূল লক্ষ্য, তাহলে মানুষ বিষয়টিকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে। উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ম মানা দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দোকানে গিয়ে প্রথমেই শাস্তির ভাষা ব্যবহার না করে নির্দেশনা দেখানো, সময়সূচি ব্যাখ্যা করা এবং প্রয়োজন হলে সতর্ক করা হলে বিরোধ কমে। আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেই দৃঢ়তা যেন অসম্মানজনক আচরণে পরিণত না হয়। প্রশাসন ও নাগরিক উভয় পক্ষই একই রাষ্ট্রের অংশ। আরেকটি বিষয় হলো, দোকান বন্ধের সময় নিয়ে বাস্তব বিভ্রান্তি। শাটার নামানোর আগে হিসাব শেষ করা, কর্মচারীদের বের হওয়া বা মালামাল গুছানোর মতো কাজ থাকতে পারে। তাই ‘দোকান বন্ধ’ বলতে ঠিক কোন সময়ের মধ্যে ক্রেতা প্রবেশ বন্ধ হবে এবং কার্যক্রম শেষ হবে এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকলে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ কমবে। জেলা পর্যায় থেকে অভিন্ন ব্যাখ্যা উপজেলা ও পৌর এলাকায় প্রচার করা যেতে পারে। প্রচার-প্রচারণা একদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কয়েক ধাপে চালানো দরকার। কার্যকর হওয়ার কয়েক দিন আগে মাইকিং ও নোটিশ, কার্যকর হওয়ার দিন পুনরায় ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে বাজার পর্যায়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এভাবে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ব্যবসায়ী সমিতি, বাজার কমিটি, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে যুক্ত করলে অল্প সময়ে ব্যাপক হারে নাগরিককের কাছে তথ্য পৌঁছানো সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রচারণার প্রমাণ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কোন বাজারে কখন মাইকিং হয়েছে, কোথায় নোটিশ টাঙানো হয়েছে, ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে কখন সভা হয়েছে এসবের সংক্ষিপ্ত রেকর্ড থাকলে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ বা বিরোধ দেখা দিলে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা সহজ হবে। একইভাবে কোনো নাগরিক নির্দেশনা বুঝতে না পারলে যোগাযোগের জন্য উপজেলা বা পৌর পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট নম্বর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে শাস্তির আগে নাগরিকের জানার অধিকার আরও কার্যকর হবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান নয়, এটি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় উদ্যোগ। তাই আগে জানাতে হবে, বুঝাতে হবে, সহযোগিতার সুযোগ দিতে হবে এবং এরপরও কেউ জেনেশুনে নিয়ম অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নামমাত্র প্রচারণা চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করাই যদি বাস্তবায়নের প্রধান চিত্র হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই আমরা কি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছি, নাকি শুধু শাস্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করছি? সরকারের একটি ভালো সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবায়ন হোক সচেতনতা, সমতা, স্বচ্ছতা ও আইনের ভিত্তিতে। নাগরিককে ভয় দেখিয়ে নয়, নাগরিককে বুঝিয়ে নিয়ম মানানোই হোক প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। কারণ নাগরিক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এক দিনের নির্দেশনা থাকবে না, এটি পরিণত হবে সবার সম্মিলিত দায়িত্বে। এজন্যই প্রশাসনের নিকট একান্ত দাবি আপনারা দোকানদারদের উপর আইন প্রয়োগের আগে আপনাদের প্রচারণা বৃদ্ধি করুন এবং সাধারণ নাগরিককে সচেতন করুন।

 

 

উপ-সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগে সচেতনতা পরে শাস্তি, নামমাত্র প্রচারণা দিয়ে জরিমানা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

আপডেট সময় : ০৮:১০:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

.আফজাল হোসেন চাঁদ

দেশের বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন শুধু সরকারের কোনো দপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহারের ওপর অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সাধারণ নাগরিককে দৈনন্দিন জীবন প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকার যখন কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করে, তখন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষকে সিদ্ধান্তটি জানানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বিধিনিষেধ কার্যকর করার আগে মানুষকে তা জানার সুযোগ দেওয়া ন্যায়সংগত প্রশাসনের মৌলিক শর্ত। বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখার ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের স্মারক অনুযায়ী বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। একই নির্দেশনায় সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা এবং বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বা অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ রাখার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ঔষধের দোকানসহ কিছু প্রতিষ্ঠান এ সময়সীমার আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। স্মারকটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানোর পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের কাছেও বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের আগে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো সাধারণ নাগরিককে কতটা জানাচ্ছে? দোকানদার, মার্কেট মালিক, ব্যবসায়ী, অনুষ্ঠান আয়োজক কিংবা পথচারী তারা কি স্পষ্টভাবে জানতে পারছেন কোন প্রতিষ্ঠান কখন খোলা রাখা যাবে, কোন আলোকসজ্জা কখন বন্ধ করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান এই বিধিনিষেধের বাইরে? যদি কোনো এলাকায় শুধু একটি মাইকিং, একটি ছোট নোটিশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে প্রচারণার দায়িত্ব শেষ করা হয়, তাহলে সেটিকে ব্যাপক জনসচেতনতা বলা কঠিন। আইন বা সরকারি নির্দেশনা মানা নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু নির্দেশনা সম্পর্কে জানানোও প্রশাসনের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্ত এমন হওয়া উচিত নয় যে, মানুষ না জেনে বা পর্যাপ্তভাবে না বুঝে সেটির লঙ্ঘন করবে এবং পরে শাস্তির মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক প্রতিদিনের কাজের সময়সূচি, কর্মচারীদের দায়িত্ব, পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা এবং আর্থিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। তাদের জন্য নতুন সময়সূচি কার্যকর হলে পর্যাপ্ত পূর্বঘোষণা, লিখিত নির্দেশনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলে প্রশাসন প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতেই পারে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত যেন জনসচেতনতার বিকল্প না হয়ে যায় এটাই গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিয়ম মানানো, রাজস্ব আদায় বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়। কোনো ব্যবসায়ী যদি স্পষ্টভাবে জানেন যে রাত ৮টার পর দোকান খোলা রাখা যাবে না, তার প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনাটি পৌঁছেছে, স্থানীয়ভাবে একাধিকবার প্রচার হয়েছে এবং তিনি জেনেশুনে তা অমান্য করেছেন, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে। কিন্তু একজন দোকানদার যদি বাস্তবে নির্দেশনাটি জানেনই না, তার এলাকায় কার্যকর প্রচার না হয়ে থাকে, কিংবা নির্দেশনার ব্যতিক্রমগুলো পরিষ্কার না থাকে, তাহলে সরাসরি জরিমানার আগে তাকে সতর্ক করা ও নিয়মটি বুঝিয়ে দেওয়াই অধিক ন্যায়সংগত পদ্ধতি। কারণ প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বোধের সমন্বয় না থাকলে একটি ভালো উদ্যোগও নাগরিককের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মতো জাতীয় স্বার্থের বিষয়কে কেন্দ্র করে জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। মানুষ যদি মনে করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা মানানোর চেয়ে জরিমানা করাই বড় উদ্দেশ্য, তাহলে উদ্যোগটির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসন যদি প্রথমে বোঝায়, পরে পর্যবেক্ষণ করে এবং সর্বশেষে ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে জনগণের সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি সমন্বিত প্রচারণা পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। জেলার প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিস, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা, বাজার কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরকে একই ভাষায় নির্দেশনার সারসংক্ষেপ প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে বাজারে মাইকিং, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যানার, দোকানের সামনে ছোট নোটিশ, স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল পেজে সব মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু শহরের বড় মার্কেট নয়, উপজেলা সদর, ইউনিয়ন বাজার এবং গ্রামীণ হাটেও প্রচারণা পৌঁছাতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দায়িত্ব শুধু শহরের ব্যবসায়ীদের নয়। প্রচারণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্দেশনার ভাষা সহজ করা। শুধু স্মারক নম্বর, সরকারি ভাষা কিংবা জটিল বাক্য প্রচার করলে সাধারণ মানুষ পুরো বিষয়টি বুঝতে নাও পারেন। কোথায় কখন দোকান বন্ধ হবে, কখন আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ হবে, আলোকসজ্জা কখন বন্ধ হবে, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কখন শেষ করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান গুলো এই সময়সীমার বাইরে এসব বিষয় তালিকা আকারে সহজ ভাষায় জানানো দরকার। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সমিতি ও মার্কেট কমিটির নেতাদের নিয়ে সভা করে নির্দেশনার ব্যাখ্যা দিতে হবে।

বিশেষ করে বাজার ও মার্কেট এলাকায় একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রতিটি মার্কেটের প্রবেশপথে বড় অক্ষরে সময়সূচি টানিয়ে দেওয়া, দোকান মালিকদের লিখিতভাবে জানানো এবং বাজার কমিটির মাধ্যমে প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে একজন ব্যবসায়ী ভুলবশত নিয়ম ভাঙার সুযোগও কম পাবেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও জানতে পারবেন যে প্রচারণা সত্যিই হয়েছে কি না। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার নির্দেশনার ব্যতিক্রম। দপ্তরের প্রকাশিত সরকারি স্মারকে খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ঔষধের দোকানসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিককের কাছে যদি এই ব্যতিক্রমগুলো স্পষ্ট না থাকে, তাহলে একদিকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যেও ব্যাখ্যার ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। তাই বাস্তবায়নের আগে প্রত্যেক এলাকায় লিখিত ও মৌখিকভাবে ব্যতিক্রমগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা যত কম হবে, বিরোধ ও অভিযোগও তত কম হবে। একই সঙ্গে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ছোট দোকান, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাধারণ ব্যবসায়ী সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে। একজন ছোট দোকানদারকে জরিমানা করে পাশের বড় প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের লঙ্ঘন উপেক্ষা করা হলে মানুষের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় যদি সত্যিই জাতীয় স্বার্থের কর্মসূচি হয়, তাহলে এর বাস্তবায়নও হতে হবে বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে আরও একটি ধাপ যুক্ত করা যেতে পারে প্রথম পর্যায়ে সচেতনতা ও সতর্কীকরণ, দ্বিতীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ, তৃতীয় পর্যায়ে ইচ্ছাকৃত ও পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট আইনে যদি সরাসরি শাস্তির বিধান বা ভিন্ন প্রক্রিয়া নির্ধারিত থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবশ্যই সেই আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনস্বার্থ, বাস্তব পরিস্থিতি ও মানুষের জানার সুযোগকে বিবেচনায় নেওয়া প্রশাসনিক ভাবে দায়িত্বশীল আচরণ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জনগণকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বরং জনগণকে অংশীদার করতে হবে। একজন দোকানদারকে বলা যেতে পারে আপনি সময়মতো দোকান বন্ধ করলে শুধু সরকারি নির্দেশনা মানছেন না, জাতীয় সম্পদ সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখছেন। একজন মার্কেট মালিককে বোঝানো যেতে পারে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি আপনার প্রতিষ্ঠানের খরচও কমতে পারে। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজককে জানানো যেতে পারে নির্ধারিত সময় মেনে অনুষ্ঠান শেষ করাও জাতীয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচির অংশ। এই ইতিবাচক বার্তা নাগরিককের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রচার ও প্রয়োগ দুটিই প্রয়োজন। শুধু প্রচারণা করে নিয়ম ভঙ্গকারীদের ছাড় দেওয়া যেমন কার্যকর নয়, তেমনি প্রচারণা দুর্বল রেখে জরিমানা করা জনআস্থার জন্যও ভালো নয়। প্রশাসনের শক্তি শুধু জরিমানা করার ক্ষমতায় নয়, মানুষকে নিয়ম মানাতে সক্ষম হওয়ার মধ্যেই প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্য।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নির্দেশনা জারির পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত স্থানীয় গণমাধ্যমকে তা সরবরাহ করা এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সময়সূচি, ব্যতিক্রম ও কার্যকর হওয়ার তারিখ বারবার জানানো গেলে নাগরিককে মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে। শুধু নির্দেশনার কপি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে মাঠপর্যায়ে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যটিও জনগণকে বুঝিয়ে বলা দরকার। মানুষ যদি শুধু শোনে ‘রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হবে, তাহলে সেটি তার কাছে আরেকটি প্রশাসনিক বিধিনিষেধ মনে হতে পারে। কিন্তু যদি বোঝানো হয় যে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও বাণিজ্যিক বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানোই মূল লক্ষ্য, তাহলে মানুষ বিষয়টিকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে। উদ্দেশ্য বুঝে নিয়ম মানা দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দোকানে গিয়ে প্রথমেই শাস্তির ভাষা ব্যবহার না করে নির্দেশনা দেখানো, সময়সূচি ব্যাখ্যা করা এবং প্রয়োজন হলে সতর্ক করা হলে বিরোধ কমে। আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেই দৃঢ়তা যেন অসম্মানজনক আচরণে পরিণত না হয়। প্রশাসন ও নাগরিক উভয় পক্ষই একই রাষ্ট্রের অংশ। আরেকটি বিষয় হলো, দোকান বন্ধের সময় নিয়ে বাস্তব বিভ্রান্তি। শাটার নামানোর আগে হিসাব শেষ করা, কর্মচারীদের বের হওয়া বা মালামাল গুছানোর মতো কাজ থাকতে পারে। তাই ‘দোকান বন্ধ’ বলতে ঠিক কোন সময়ের মধ্যে ক্রেতা প্রবেশ বন্ধ হবে এবং কার্যক্রম শেষ হবে এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকলে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ কমবে। জেলা পর্যায় থেকে অভিন্ন ব্যাখ্যা উপজেলা ও পৌর এলাকায় প্রচার করা যেতে পারে। প্রচার-প্রচারণা একদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কয়েক ধাপে চালানো দরকার। কার্যকর হওয়ার কয়েক দিন আগে মাইকিং ও নোটিশ, কার্যকর হওয়ার দিন পুনরায় ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে বাজার পর্যায়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এভাবে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ব্যবসায়ী সমিতি, বাজার কমিটি, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে যুক্ত করলে অল্প সময়ে ব্যাপক হারে নাগরিককের কাছে তথ্য পৌঁছানো সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রচারণার প্রমাণ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কোন বাজারে কখন মাইকিং হয়েছে, কোথায় নোটিশ টাঙানো হয়েছে, ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে কখন সভা হয়েছে এসবের সংক্ষিপ্ত রেকর্ড থাকলে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ বা বিরোধ দেখা দিলে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা সহজ হবে। একইভাবে কোনো নাগরিক নির্দেশনা বুঝতে না পারলে যোগাযোগের জন্য উপজেলা বা পৌর পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট নম্বর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে শাস্তির আগে নাগরিকের জানার অধিকার আরও কার্যকর হবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান নয়, এটি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় উদ্যোগ। তাই আগে জানাতে হবে, বুঝাতে হবে, সহযোগিতার সুযোগ দিতে হবে এবং এরপরও কেউ জেনেশুনে নিয়ম অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নামমাত্র প্রচারণা চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করাই যদি বাস্তবায়নের প্রধান চিত্র হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই আমরা কি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছি, নাকি শুধু শাস্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করছি? সরকারের একটি ভালো সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবায়ন হোক সচেতনতা, সমতা, স্বচ্ছতা ও আইনের ভিত্তিতে। নাগরিককে ভয় দেখিয়ে নয়, নাগরিককে বুঝিয়ে নিয়ম মানানোই হোক প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। কারণ নাগরিক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এক দিনের নির্দেশনা থাকবে না, এটি পরিণত হবে সবার সম্মিলিত দায়িত্বে। এজন্যই প্রশাসনের নিকট একান্ত দাবি আপনারা দোকানদারদের উপর আইন প্রয়োগের আগে আপনাদের প্রচারণা বৃদ্ধি করুন এবং সাধারণ নাগরিককে সচেতন করুন।