০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

বর্ষা মৌসুম এলেই ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৬:০৯:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • / ১৮

মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি:

বর্যার পানি বাড়তে শুরু করলেই বদলে যায় অনেক দৃশ্য। নদী-নালা,খাল-বিল পানিতে ভরে উঠার পাশাপাশি কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েন নৌকা তৈরির কারিগররা। বিভিন্ন বাজারে, সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কাঠ কাটার শব্দ, হাতুড়ির আঘাত আর কারিগরদের ব্যস্ত সময়।

বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরনো ঐতিহ্যবাহী পেশা নৌকা তৈরি। ধনাগোদা, পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নৌকার চাহিদাও।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় নৌকা তৈরি, কেনা-বেঁচা, পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নৌকা তৈরির কারিগররা। পদ্মা, মেঘনা,ধনাগোদা, ডাকাতিয়া নদী ঘেঁষে চাঁদপুর জেলা। জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে নৌকা।

নদী তীরবর্তী এলাকা বলেই নৌকা তৈরির ধুম দেখা যাচ্ছে। মতলব উত্তরের ষাটনল, সটাকী, কালীর বাজার, শ্রী রায়ের চর (বাংলা বাজার), আমিরাবাদ মতলব দক্ষিণের মুন্সীরহাট বাজার, নায়েরগাঁও বাজার, নারায়নপুর, ধনারপাড়, নাগদা, বরদিয়া, মোবারকদী, ডাকঘর, বাইশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকা তৈরির কাজ চলছে। আবার কোথাও কোথাও সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট। তৈরি হচ্ছে সড়কের পাশেই নৌকা। যেনো একেকটি ছোট শিল্পকেন্দ্র।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও কাঠ চিরানো হচ্ছে, কোথাও মাপ অনুযায়ী তক্তা বসানো হচ্ছে, আবার কোথাও হাতুড়ি দিয়ে কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানোর কাজ চলছে। কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, কাঠ মসৃণ, লোহার পাত, পেরেক দিয়ে কাঠ লাগানো সবই চলে সমানতালে। দিন রাত পরিশ্রম করছেন কারিগররা। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে তৈরি নৌকা। কিছু নৌকা আগে থেকেই রাখা হয়েছে। আবার কিছু নৌকা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী। কেউ গরু ছাগলের ঘাস কাঁটার জন্য, কেউ মাছ ধরার জন্য, আবার কেউ পরিবার নিয়ে চলাচলের জন্য কিনছেন নৌকা।

মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা এই চার নদী বেষ্টিত জনপদ চাঁদপুর। বিভিন্ন অঞ্চল চরাঞ্চল। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে বছরের পর বছর। চর এলাকা থেকে বিভিন্ন কৃষিজাত ফসলাদি, বিভিন্ন হাটবাজারে আনা-নেওয়ার লোকজন পারাপার এবং মাছ শিকারের একমাত্র বাহন এই নৌকা। তাই প্রায় সারা বছরই এসব চরাঞ্চলের মানুষ নৌকার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় এদের প্রয়োজন হয় ছোট-বড় সব ধরনের নৌকা। এবারও মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলাসহ বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার অনেকেই বিভিন্ন হাট থেকে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা কেনাসহ বড় সাইজের নতুন নৌকা তৈরি এবং পুরোনো নৌকাগুলো মেরামত কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। মতলবের তৈরি নৌকা জেলার প্রায় সব উপজেলায় কেনা বেচা হচ্ছে। জেলার বাইরে থেকেও অনেক ক্রেতা আসে নৌকা ক্রয় করতে মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায়।

উপজেলার সটাকী বাজারের ব্যবসায়ী দুলাল প্রধান (৫৮) বলেন, আমি দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত কাঠ ব্যবসা এই নৌকা তৈরি ব্যবসায় জািড়ত । আমি প্রথমে এই সটাকী বাজারে প্রথম নৌকা বানাই এবং বিক্রি করি। এছাড়া আমি বিভিন্ন হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে কমদামি খাট, চৌকি, দরজা, জানালা তৈরি এবং পাইকারি কাঠ বিক্রি করি। আর বর্ষা এলে নৌকা বানাই। এ সময় আমার কারিগররা দম ফেলার সময় পায় না। আমার একজন কারিগর দিনে একটা নৌকা বানায়। সারা সপ্তাহে যা নৌকা বানানো হয় খুচরা দুই-একটা বিক্রি ছাড়া সব নৌকা বিক্রি হয়ে যায় সাপ্তাহিক হাটের দিন শনিবার ও মঙ্গলবার। এ হাটে ১০-১২টি নৌকা বিক্রি করতে পারি। পানি বাড়লে বিক্রি বাড়বে।
মতলব উত্তরের সটাকী এলাকার নৌকা তৈরির কারিগর বিল্লাল (৪৫) বলেন, বর্ষা মৌসুমের এই দুই-তিন মাস আমরা প্রতিদিন গড়ে হাজার টাকা আয় করতে পারি। কাজেও ঝুঁকি কম।

মতলব দক্ষিণ উপজেলার মোবারকদী এলাকার নৌকা ব্যবসায়ী হান্নান প্রধান বলেন, বর্ষা আসার মাস দুয়েক আগে থেকেই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মেহগনি, কড়ই এবং চাম্বল কাঠের নৌকার চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। ছোট ডিঙি নৌকাগুলো মানুষ বেশি কিনছে। কারণ এগুলো বর্ষায় মাছ ধরা বা যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক। তবে কাঠ আর লোহার সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকার অর্ডার দিচ্ছে, কারিগররা দিন-রাত কাজ করেও সামাল দিতে পারছি না। খেতে হচ্ছে হিমশিম। শুধু চাঁদপুর নয় আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও নৌকা কিনতে আসে ক্রেতারা। এখনও কম হচ্ছে না তবে বর্তমানের চেয়ে আগে নৌকা বেশি বিক্রি হতো।

নৌকার ক্রেতা মজিবুর রহমান বলেন, ছোট নৌকার দাম একরকম, বড় ও মাঝারি নৌকার দাম ভিন্ন। সাধারণ মানের একটি নৌকা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে কম দামে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে নৌকা পাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলো বেশিদিন টেকসই হয় না।

নৌকা তৈরির কারিগর রাসেল বলেন, একটি নৌকা তৈরি করতে অনেক ধাপ রয়েছে। প্রথমে কাঠ নির্বাচন,তারপর কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, মাপ, মাপ অনুযায়ী কাঠ বসানো,পরে লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানোর কাজ করতে হয়। একটি নৌকা তৈরি করতে একজন কারিগরের দুইদিন সময় লাগে। একদিনে আমাদের মজুরি দেয় এক হাজার টাকা। আমরা দিন রাত কাজ করি। কাঠসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বেশি। আমরা ক্রেতাদের ভালো মান দিতে সব সময় চেষ্টা করি।

নারায়নপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা সুমন পাটোয়ারী বলেন, বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর এ সময়ে নৌকা তৈরি, মেরামত করা এবং নতুন নৌকা কেনার হিড়িক পড়ে যায়। মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা, গরু ছাগলের ঘাস কাটার কাজেও ব্যবহার করা হয়। শুধু বর্ষাকালে নয়, সারা বছর কম-বেশি ছোট-বড় এসব নৌকা চর এলাকার মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী।

আশ্বিনপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ খান বলেন, এবার অনেকেই নৌকা তৈরি করছে। বিভিন্ন হাটবাজার থেকে এক সিজনের জন্য ১২থেকে ১৩ হাতের ছোট সাইজের নৌকা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বাজার থেকে কিনে আনছে অনেকেই। ছোট নৌকা মূলত বর্ষাকালে মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাতায়াতের জন্য বেশি ব্যবহার করা হয়। আর ৩০ থেকে ৪০ হাত একটা নৌকা তৈরি করতে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এটি শ্যালো ইঞ্জিন দ্বারা চালিয়ে ক্ষেত থেকে ফসলাদি আনা, দূরদূরান্ত হাট-বাজার থেকে মালামাল আনা-নেওয়া করা এবং মানুষজন পারাপারের জন্য বড় নৌকা বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে।

নৌকার কারিগর মো.আলমাছ বলেন, আমরা গরীব মানুষ। কাজ করতে পারলে কপালে খাবার জুটে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরি কইরা সংসার চালাই। এভাবে আমাদের জীবনমান চলতে পারে না। সরকারের কাছে আমরা সহযোগিতা চাই।

নৌকা একটি উপকারী বাহন। নৌকা বিক্রি করে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। তেমনি ক্রেতা নৌকা ক্রয় করেও উপকৃত হয়।

 

বর্ষা মৌসুম এলেই ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা

আপডেট সময় : ০৬:০৯:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি:

বর্যার পানি বাড়তে শুরু করলেই বদলে যায় অনেক দৃশ্য। নদী-নালা,খাল-বিল পানিতে ভরে উঠার পাশাপাশি কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েন নৌকা তৈরির কারিগররা। বিভিন্ন বাজারে, সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কাঠ কাটার শব্দ, হাতুড়ির আঘাত আর কারিগরদের ব্যস্ত সময়।

বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরনো ঐতিহ্যবাহী পেশা নৌকা তৈরি। ধনাগোদা, পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নৌকার চাহিদাও।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় নৌকা তৈরি, কেনা-বেঁচা, পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নৌকা তৈরির কারিগররা। পদ্মা, মেঘনা,ধনাগোদা, ডাকাতিয়া নদী ঘেঁষে চাঁদপুর জেলা। জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে নৌকা।

নদী তীরবর্তী এলাকা বলেই নৌকা তৈরির ধুম দেখা যাচ্ছে। মতলব উত্তরের ষাটনল, সটাকী, কালীর বাজার, শ্রী রায়ের চর (বাংলা বাজার), আমিরাবাদ মতলব দক্ষিণের মুন্সীরহাট বাজার, নায়েরগাঁও বাজার, নারায়নপুর, ধনারপাড়, নাগদা, বরদিয়া, মোবারকদী, ডাকঘর, বাইশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকা তৈরির কাজ চলছে। আবার কোথাও কোথাও সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট। তৈরি হচ্ছে সড়কের পাশেই নৌকা। যেনো একেকটি ছোট শিল্পকেন্দ্র।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও কাঠ চিরানো হচ্ছে, কোথাও মাপ অনুযায়ী তক্তা বসানো হচ্ছে, আবার কোথাও হাতুড়ি দিয়ে কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানোর কাজ চলছে। কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, কাঠ মসৃণ, লোহার পাত, পেরেক দিয়ে কাঠ লাগানো সবই চলে সমানতালে। দিন রাত পরিশ্রম করছেন কারিগররা। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে তৈরি নৌকা। কিছু নৌকা আগে থেকেই রাখা হয়েছে। আবার কিছু নৌকা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী। কেউ গরু ছাগলের ঘাস কাঁটার জন্য, কেউ মাছ ধরার জন্য, আবার কেউ পরিবার নিয়ে চলাচলের জন্য কিনছেন নৌকা।

মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা এই চার নদী বেষ্টিত জনপদ চাঁদপুর। বিভিন্ন অঞ্চল চরাঞ্চল। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে বছরের পর বছর। চর এলাকা থেকে বিভিন্ন কৃষিজাত ফসলাদি, বিভিন্ন হাটবাজারে আনা-নেওয়ার লোকজন পারাপার এবং মাছ শিকারের একমাত্র বাহন এই নৌকা। তাই প্রায় সারা বছরই এসব চরাঞ্চলের মানুষ নৌকার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় এদের প্রয়োজন হয় ছোট-বড় সব ধরনের নৌকা। এবারও মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলাসহ বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার অনেকেই বিভিন্ন হাট থেকে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা কেনাসহ বড় সাইজের নতুন নৌকা তৈরি এবং পুরোনো নৌকাগুলো মেরামত কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। মতলবের তৈরি নৌকা জেলার প্রায় সব উপজেলায় কেনা বেচা হচ্ছে। জেলার বাইরে থেকেও অনেক ক্রেতা আসে নৌকা ক্রয় করতে মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায়।

উপজেলার সটাকী বাজারের ব্যবসায়ী দুলাল প্রধান (৫৮) বলেন, আমি দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত কাঠ ব্যবসা এই নৌকা তৈরি ব্যবসায় জািড়ত । আমি প্রথমে এই সটাকী বাজারে প্রথম নৌকা বানাই এবং বিক্রি করি। এছাড়া আমি বিভিন্ন হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে কমদামি খাট, চৌকি, দরজা, জানালা তৈরি এবং পাইকারি কাঠ বিক্রি করি। আর বর্ষা এলে নৌকা বানাই। এ সময় আমার কারিগররা দম ফেলার সময় পায় না। আমার একজন কারিগর দিনে একটা নৌকা বানায়। সারা সপ্তাহে যা নৌকা বানানো হয় খুচরা দুই-একটা বিক্রি ছাড়া সব নৌকা বিক্রি হয়ে যায় সাপ্তাহিক হাটের দিন শনিবার ও মঙ্গলবার। এ হাটে ১০-১২টি নৌকা বিক্রি করতে পারি। পানি বাড়লে বিক্রি বাড়বে।
মতলব উত্তরের সটাকী এলাকার নৌকা তৈরির কারিগর বিল্লাল (৪৫) বলেন, বর্ষা মৌসুমের এই দুই-তিন মাস আমরা প্রতিদিন গড়ে হাজার টাকা আয় করতে পারি। কাজেও ঝুঁকি কম।

মতলব দক্ষিণ উপজেলার মোবারকদী এলাকার নৌকা ব্যবসায়ী হান্নান প্রধান বলেন, বর্ষা আসার মাস দুয়েক আগে থেকেই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মেহগনি, কড়ই এবং চাম্বল কাঠের নৌকার চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। ছোট ডিঙি নৌকাগুলো মানুষ বেশি কিনছে। কারণ এগুলো বর্ষায় মাছ ধরা বা যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক। তবে কাঠ আর লোহার সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকার অর্ডার দিচ্ছে, কারিগররা দিন-রাত কাজ করেও সামাল দিতে পারছি না। খেতে হচ্ছে হিমশিম। শুধু চাঁদপুর নয় আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও নৌকা কিনতে আসে ক্রেতারা। এখনও কম হচ্ছে না তবে বর্তমানের চেয়ে আগে নৌকা বেশি বিক্রি হতো।

নৌকার ক্রেতা মজিবুর রহমান বলেন, ছোট নৌকার দাম একরকম, বড় ও মাঝারি নৌকার দাম ভিন্ন। সাধারণ মানের একটি নৌকা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে কম দামে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে নৌকা পাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলো বেশিদিন টেকসই হয় না।

নৌকা তৈরির কারিগর রাসেল বলেন, একটি নৌকা তৈরি করতে অনেক ধাপ রয়েছে। প্রথমে কাঠ নির্বাচন,তারপর কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, মাপ, মাপ অনুযায়ী কাঠ বসানো,পরে লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানোর কাজ করতে হয়। একটি নৌকা তৈরি করতে একজন কারিগরের দুইদিন সময় লাগে। একদিনে আমাদের মজুরি দেয় এক হাজার টাকা। আমরা দিন রাত কাজ করি। কাঠসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বেশি। আমরা ক্রেতাদের ভালো মান দিতে সব সময় চেষ্টা করি।

নারায়নপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা সুমন পাটোয়ারী বলেন, বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর এ সময়ে নৌকা তৈরি, মেরামত করা এবং নতুন নৌকা কেনার হিড়িক পড়ে যায়। মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা, গরু ছাগলের ঘাস কাটার কাজেও ব্যবহার করা হয়। শুধু বর্ষাকালে নয়, সারা বছর কম-বেশি ছোট-বড় এসব নৌকা চর এলাকার মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী।

আশ্বিনপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ খান বলেন, এবার অনেকেই নৌকা তৈরি করছে। বিভিন্ন হাটবাজার থেকে এক সিজনের জন্য ১২থেকে ১৩ হাতের ছোট সাইজের নৌকা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বাজার থেকে কিনে আনছে অনেকেই। ছোট নৌকা মূলত বর্ষাকালে মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাতায়াতের জন্য বেশি ব্যবহার করা হয়। আর ৩০ থেকে ৪০ হাত একটা নৌকা তৈরি করতে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এটি শ্যালো ইঞ্জিন দ্বারা চালিয়ে ক্ষেত থেকে ফসলাদি আনা, দূরদূরান্ত হাট-বাজার থেকে মালামাল আনা-নেওয়া করা এবং মানুষজন পারাপারের জন্য বড় নৌকা বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে।

নৌকার কারিগর মো.আলমাছ বলেন, আমরা গরীব মানুষ। কাজ করতে পারলে কপালে খাবার জুটে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরি কইরা সংসার চালাই। এভাবে আমাদের জীবনমান চলতে পারে না। সরকারের কাছে আমরা সহযোগিতা চাই।

নৌকা একটি উপকারী বাহন। নৌকা বিক্রি করে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। তেমনি ক্রেতা নৌকা ক্রয় করেও উপকৃত হয়।