১০:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

বদলি ঠেকিয়ে মতলব উত্তরে বহাল সমবায় কর্মকর্তা, উঠছে দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ১২:৩৯:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • / ১৭

Oplus_16908288

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী হয়রানি ও সমবায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সমবায়ী, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের একাধিক অভিযোগে বেরিয়ে এসেছে নানা অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থেকে তিনি বছরের পর বছর একই উপজেলায় প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান অনেকেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে প্রায় ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা সমবায় কার্যালয়, চাঁদপুরের স্মারক নং-১২৪৮, তারিখ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ অনুযায়ী তাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ জমা হতে থাকে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে মোহনপুর সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখের ১৭১ নং স্মারকে তাকে পুনরায় চাঁদপুর সদর উপজেলায় বদলির আদেশ দেয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি সেই বদলি আদেশ স্থগিত করিয়ে আবারও মতলব উত্তর উপজেলাতেই বহাল থাকেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, “একটি উপজেলায় এত দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করায় তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।”

এদিকে “উন্নয়ন জাতের গাভী পালনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্প”-এ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এক সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রকল্পের নীতিমালা পরিবর্তন করে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও তাদের ঘনিষ্ঠদের মাঝে লাখ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। বর্তমানে সেই অর্থের বড় অংশই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এমনকি অনেক সুবিধাভোগীর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে-বেনামে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হলেও তার অধিকাংশের এক টাকাও আদায় হয়নি। এক আদায়কারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “বেশ কিছু ঋণ কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তব কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।”

এছাড়া সিভিডিপি প্রকল্পের গ্রামকর্মীদের সম্মানীর টাকা থেকেও নিয়মিত কমিশন কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। একাধিক গ্রামকর্মীর দাবি, প্রতি মাসেই সম্মানীর টাকা দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে রাখা হতো। আরও অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে ৮ থেকে ১০ জন ভুয়া গ্রামকর্মীর নাম দেখিয়ে তাদের নামে বরাদ্দকৃত সম্মানীর অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগের আরও ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে এক নারী গ্রামকর্মীর বক্তব্যে। তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিরক্ত করতেন এবং রাতের বেলায় মোবাইলে আপত্তিকর বার্তা পাঠাতেন। এমনকি তাকে চাঁদপুরে একটি হোটেলে যাওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে নিরাপত্তাহীনতায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানান ওই নারী।

শুধু তাই নয়, উপজেলার বিভিন্ন সমবায় সমিতির কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন সমবায়ীরা। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা না দিলে সমিতির নিবন্ধন বাতিল কিংবা অডিট জটিলতায় ফেলার ভয় দেখানো হতো। এখলাছপুর আলোকিত সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড ও ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেতৃবৃন্দ তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

সবশেষে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে ভূয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সমিতির সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক আলম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপন

সাবধান
এই পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু কপি করতে পারবেন না

বদলি ঠেকিয়ে মতলব উত্তরে বহাল সমবায় কর্মকর্তা, উঠছে দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ

আপডেট সময় : ১২:৩৯:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী হয়রানি ও সমবায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সমবায়ী, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের একাধিক অভিযোগে বেরিয়ে এসেছে নানা অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থেকে তিনি বছরের পর বছর একই উপজেলায় প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান অনেকেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে প্রায় ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা সমবায় কার্যালয়, চাঁদপুরের স্মারক নং-১২৪৮, তারিখ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ অনুযায়ী তাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মতলব উত্তর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ জমা হতে থাকে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে মোহনপুর সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখের ১৭১ নং স্মারকে তাকে পুনরায় চাঁদপুর সদর উপজেলায় বদলির আদেশ দেয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি সেই বদলি আদেশ স্থগিত করিয়ে আবারও মতলব উত্তর উপজেলাতেই বহাল থাকেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, “একটি উপজেলায় এত দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করায় তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।”

এদিকে “উন্নয়ন জাতের গাভী পালনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্প”-এ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এক সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রকল্পের নীতিমালা পরিবর্তন করে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও তাদের ঘনিষ্ঠদের মাঝে লাখ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। বর্তমানে সেই অর্থের বড় অংশই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এমনকি অনেক সুবিধাভোগীর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে-বেনামে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হলেও তার অধিকাংশের এক টাকাও আদায় হয়নি। এক আদায়কারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “বেশ কিছু ঋণ কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তব কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।”

এছাড়া সিভিডিপি প্রকল্পের গ্রামকর্মীদের সম্মানীর টাকা থেকেও নিয়মিত কমিশন কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। একাধিক গ্রামকর্মীর দাবি, প্রতি মাসেই সম্মানীর টাকা দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে রাখা হতো। আরও অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে ৮ থেকে ১০ জন ভুয়া গ্রামকর্মীর নাম দেখিয়ে তাদের নামে বরাদ্দকৃত সম্মানীর অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগের আরও ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে এক নারী গ্রামকর্মীর বক্তব্যে। তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিরক্ত করতেন এবং রাতের বেলায় মোবাইলে আপত্তিকর বার্তা পাঠাতেন। এমনকি তাকে চাঁদপুরে একটি হোটেলে যাওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে নিরাপত্তাহীনতায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানান ওই নারী।

শুধু তাই নয়, উপজেলার বিভিন্ন সমবায় সমিতির কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন সমবায়ীরা। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা না দিলে সমিতির নিবন্ধন বাতিল কিংবা অডিট জটিলতায় ফেলার ভয় দেখানো হতো। এখলাছপুর আলোকিত সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড ও ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেতৃবৃন্দ তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

সবশেষে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছেংগারচর পৌর বণিক সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে ভূয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সমিতির সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফারুক আলম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন