দিন দিন অবুঝ হয়ে যাচ্ছে মানবসভ্যতা, তবুও মানবজাতি শ্রেষ্ঠ
- আপডেট সময় : ০৭:০৯:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
- / ৫৭

আফজাল হোসেন চাঁদ:
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত অগ্রগতির ইতিহাস। হাজার বছরের পথচলায় মানুষ গুহাবাসী জীবন থেকে আধুনিক নগরসভ্যতায় পৌঁছেছে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য, মহাকাশ অনুসন্ধান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সবকিছুই প্রমাণ করে মানুষ সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও আজ ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে প্রযুক্তিতে এগোলেও কি মানুষ সত্যিই মানবিকতায় এগোচ্ছে ? নাকি আমরা জ্ঞান অর্জন করলেও প্রজ্ঞা হারাচ্ছি ? সভ্যতার বাহ্যিক উন্নতি যত দ্রুত হচ্ছে, মানবিক চেতনার ভিত ততটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের প্রাচুর্য রয়েছে। কিন্তু তথ্যের ভিড়ে সত্যকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বিভক্তি, বিদ্বেষ, গুজব এবং অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। মানুষ এখন মুহূর্তেই মতামত দিয়ে ফেলে, কিন্তু চিন্তা করার সময় নেয় না। অন্যের অনুভূতি বোঝার চেয়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করাই যেন বড় হয়ে উঠেছে। ফলে সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা বিস্তার লাভ করছে। পরিবার, যা একসময় মানুষের প্রথম শিক্ষালয় ছিল, আজ নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী জীবনধারা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সম্পর্কের কারণে মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। সন্তানরা অনেক সময় বাবা-মায়ের সান্নিধ্য নয়, মোবাইলের পর্দায় বেশি সময় কাটায়। আবার অনেক প্রবীণ মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকীত্বের ভার বহন করেন। সম্পর্কের এই দূরত্ব কেবল একটি পরিবারের নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন অর্থই মানুষের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন নৈতিকতা পিছিয়ে পড়ে। অসততা, দুর্নীতি, প্রতারণা, অন্যের অধিকার হরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তখন সমাজে স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। মানুষ ভুলে যায় অর্থ জীবনের প্রয়োজন, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য নয়। বস্তুগত উন্নতি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং কল্যাণ নিশ্চিত করে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ, সহিংসতা এবং মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। অথচ একই পৃথিবীতে বিপুল সম্পদও রয়েছে। এই বৈপরীত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় সমস্যা সম্পদের অভাবে নয়; বরং ন্যায্য বণ্টন, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের ঘাটতিতে।
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছেন। এই মর্যাদা কোনো জাতি, বর্ণ, ভাষা বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে নয়; বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের অন্তর্নিহিত সম্মানের ভিত্তিতে। আবার কোরআনে মানুষকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কেবল ভোগের জন্য সৃষ্টি হয়নি; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সৃষ্টির কল্যাণ এবং পৃথিবীকে সুন্দরভাবে পরিচালনার দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবন মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি সত্যবাদিতা, দয়া, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা এবং সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছেন। প্রতিবেশী, এতিম, অসহায়, নারী, শিশু, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সবার অধিকার রক্ষার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়; বরং তার চরিত্র, আচরণ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধে। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি মতের অমিলকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। অথচ সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যুক্তি এবং সংলাপের ভিত্তিতে। ইসলামের শিক্ষাতেও উত্তম কথা বলার, ধৈর্য ধারণের এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভিন্নমতকে ঘৃণা নয়, যুক্তি ও সৌজন্যের মাধ্যমে মোকাবিলা করাই সভ্যতার লক্ষণ। পরিবেশ ধ্বংসও বর্তমান সভ্যতার একটি বড় সংকট। বন উজাড়, নদী দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ উন্নয়নের নামে অনেক সময় প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য নষ্ট করছে। অথচ ইসলাম অপচয়কে নিরুৎসাহিত করেছে এবং পৃথিবীকে আমানত হিসেবে রক্ষা করার শিক্ষা দিয়েছে। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ কেবল পরিবেশ রক্ষাই নয়, মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখারও পূর্বশর্ত। প্রযুক্তির ব্যবহারও আজ এক দ্বিমুখী বাস্তবতা। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে উন্নত করেছে, দূরত্ব কমিয়েছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি মিথ্যা প্রচার, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, চরিত্রহনন কিংবা আসক্তির মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে তা আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে মানুষের বিবেক দিয়ে; অন্যথায় প্রযুক্তিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে।
শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল বা চাকরি পাওয়ার জন্য শিক্ষা যথেষ্ট নয়। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা একজন মানুষকে সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক এবং নৈতিক করে তোলে। জ্ঞান ও চরিত্রের সমন্বয় ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না। একজন দক্ষ কিন্তু নীতিহীন মানুষ সমাজের জন্য যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি একজন সৎ ও দক্ষ মানুষ একটি জাতির সম্পদে পরিণত হন। তবুও সবকিছুর পরেও মানবজাতি শ্রেষ্ঠ। কারণ মানুষ ভুল করে, আবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতাও রাখে। মানুষ ধ্বংস করে, আবার পুনর্গঠনও করে। মানুষ কাঁদে, অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায় এবং নতুন করে শুরু করতে পারে। এই আত্মসমালোচনার ক্ষমতা, নৈতিক বিবেক এবং পরিবর্তনের সামর্থ্যই মানুষকে অন্য সৃষ্টির থেকে আলাদা করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অন্ধকার সময়ের পরও মানুষ বারবার আলোর পথ খুঁজে নিয়েছে। করোনা মহামারির সময় আমরা যেমন মানবতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখেছি, তেমনি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও দেখেছি মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসংখ্য মানুষ মানবকল্যাণে কাজ করেছেন। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে মানুষের ভেতরে এখনও ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ জীবিত আছে। সেই শক্তিকেই আরও জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি। অন্যের ভুল দেখার আগে নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, বিদ্যালয়ে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, সমাজে আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহি নিশ্চিত হলে মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে চর্চা করতে হবে। কারণ মানবসভ্যতা কেবল ইট-পাথরের উন্নয়নে নয়; মানুষের চরিত্র ও আচরণের উন্নতিতেই প্রকৃত অর্থে বিকশিত হয়। আমরা যদি সত্যকে মূল্য দিই, অন্যের অধিকারকে সম্মান করি, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াই, পরিবেশ রক্ষা করি, পরিবারকে সময় দিই এবং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করি, তবে সভ্যতার সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ইসলামও মানুষকে মধ্যপন্থা, ভারসাম্য, ন্যায়, দয়া এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিয়েছে। এই শিক্ষাগুলো কেবল মুসলমানদের জন্য নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধ হিসেবে সমগ্র মানবসমাজের জন্য কল্যাণকর।
অতএব, দিন দিন মানবসভ্যতা যেন কিছু ক্ষেত্রে অবুঝ হয়ে পড়ছে এ কথা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এটিও সত্য যে মানবজাতির সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের বিবেক এখনও জাগ্রত হতে পারে, মানবতা এখনও জয়ী হতে পারে, ন্যায় এখনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাই হতাশা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা; বিভাজন নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা; ঘৃণা নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা; অন্ধ প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রযুক্তিতে নয়, প্রাসাদে নয়, ক্ষমতায় নয়; মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার বিবেক, ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং স্রষ্টার প্রতি দায়িত্বশীলতায়। যতদিন এই মূল্যবোধ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, ততদিন সব সংকট, সব বিভ্রান্তি এবং সব অবুঝতার মাঝেও মানবজাতি শ্রেষ্ঠই থাকবে। -লেখক ও কলামিষ্ট : আফজাল হোসেন চাঁদ, সংবাদকর্মী, ঝিকরগাছা, যশোর। আলাপন- ০১৯১২-০৭০২০৯।













