মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি:
চাঁদপুরের মতলব উত্তর মাদক মামলার আসামি মো. জনি খানের রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গাপুর ইউনিয়নের ওলীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের বাড়ির গোসলখানা থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া আগেই তার মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর সময় তার পরনে থাকা পোশাক, শেষ মুহূর্তে তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়, মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত ব্যাগ এবং মাদক ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেনের বক্তব্যের অসঙ্গতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
নিহত জনি খান উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের কামালদী-মাথাভাঙ্গা গ্রামের আবুল কাশেম খানের ছেলে। স্থানীয়ভাবে মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত জনির বিরুদ্ধে মাদক'সহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ওলীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের বাড়ির গোসলখানা থেকে জনিকে উদ্ধার করে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো জনি বিল্লালের বাড়িতে যাওয়ার সময় প্যান্ট ও টি সার্ট পরিহিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। কিন্তু মৃত্যুর সময় তার পরনে ছিল বিল্লাল হোসেনের ব্যবহৃত লুঙ্গি। কী কারণে জনির পোশাক পরিবর্তন হয়েছিল, কে তাকে পোশাক পরিবর্তন করতে দিয়েছিল এবং কখন ও কী পরিস্থিতিতে তিনি লুঙ্গি পরেছিলেন এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
জনির সঙ্গে সবসময় একটি ব্যাগ থাকত বলেও স্থানীয়দের দাবি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়নি বলে জানা গেছে। তবে ওই ব্যাগে কী ছিল, মৃত্যুর আগে ব্যাগটি কার কাছে ছিল এবং মোবাইল ফোনে শেষ সময়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল এসব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
জনিকে বিল্লালের বাড়িতে নিয়ে আসা, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসক ডাকা এবং হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে বিল্লাল হোসেনের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিল্লালের বক্তব্য অনুযায়ী, জাহিরাবাদ ইউনিয়নের নেদমদি গ্রামের ইব্রাহীম নামে এক মোটরসাইকেল চালক জনিকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। ইব্রাহীম তাকে জানান, জনির বুক ও গলায় জ্বালাপোড়া করছে। পরে বিল্লাল পাশের বাড়ির পল্লী চিকিৎসক মহসিনকে ডেকে আনেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জনিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পরামর্শ দেন বলে বিল্লাল জানান।
তবে স্থানীয়দের দাবি, জনির সঙ্গে বিল্লাল ও ইব্রাহীমের আগে থেকেই পরিচয় ছিল এবং ঘটনার দিন তারা একসঙ্গে নতুন বাজার থেকে খিচুড়ি কিনে বিল্লালের বাড়িতে গিয়ে খেয়েছেন। স্থানীয়দের এমন দাবির সঙ্গে বিল্লালের দেওয়া বক্তব্যের কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে, বিল্লাল একদিকে ইব্রাহীমকে পরিচিত বলে দাবি করলেও তার বাড়ির পরিচয় বলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন এমন দাবি করেছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে জনিকে তিনি কতটা চিনতেন, সে বিষয়েও তার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
ঘটনার পর জনিকে মোটরসাইকেলে করে বিল্লালের বাড়িতে নিয়ে আসা ইব্রাহীমের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর থেকে ইব্রাহীমকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। ইব্রাহীম কেন জনিকে বিল্লালের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন, জনির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল, জনি অসুস্থ হওয়ার আগে কোথায় ছিলেন এবং ঘটনার পর তিনি কোথায় গেছেন এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
জনির মৃত্যুর পর বিল্লাল হোসেনের দেওয়া বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
মো. রুবেল সরকার নামে একজন মন্তব্য করেন, ও (বিল্লাল) বলতেছে ওর ড্রাইভার, কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা ড্রাইভারের নাম বলতে পারে না। কথা হলো, ড্রাইভারের বাড়ি লতরদী, দুপুরবেলায় ওনার বাড়িতে কেন আসলো, আর উনি বা কেন ডাক্তার দেখাইলো? বিষয়টা আইন অনুযায়ী সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। মো. নুরুল ইসলাম নামে একজন মন্তব্য করেন, সব তদন্তের পরে দেখবেন সাক্ষাৎকার দেওয়া লোকটাই ফেঁসে গেছে।
মোশাররফ হোসেন নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, ড্রাইভার তার পরিচিত কিন্তু নাম বলতে পারে না। মাদক ব্যবসায়ী তার বাড়িতে কেন? প্রশাসনের কর্তৃপক্ষকে একটু খোঁজখবর নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, জনি প্রায়ই বিল্লালের বাড়িতে অবস্থান করতেন। ঘটনার দিনও জনি, বিল্লাল ও ইব্রাহীমকে একসঙ্গে দেখা গেছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের প্রশ্ন, একজন ব্যক্তি অন্যের বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন এমন ঘটনায় তার পোশাক কেন পরিবর্তন হলো, তার ব্যক্তিগত ব্যাগের কী অবস্থা ছিল, তার মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল এবং তাকে কে ও কী উদ্দেশ্যে ওই বাড়িতে নিয়ে গেল এসব বিষয় তদন্ত ছাড়া পরিষ্কার হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, একজন ব্যক্তি যতই অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা পরিবারের পাশাপাশি সমাজেরও অধিকার। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার দাবি তাদের।
তাদের আরও দাবি, বিল্লাল হোসেন ও ইব্রাহীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জনির মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে কাউকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, সেটি পুলিশের তদন্তের বিষয়। এদিকে জনির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। এ ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে।
লাশের সুরতহাল তৈরি করেন মতলব উত্তর থানার এসআই মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, মাদক ব্যবসায়ী জনির লাশ দুর্গাপুর ইউনিয়নের ওলীপুর গ্রামের বিল্লালের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ময়নাতদন্ত শেষে জনি খানের মরদেহ তার নিজ এলাকা মোহনপুর ইউনিয়নের কামালদী-মাথাভাঙ্গা গ্রামে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ কী আসে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনির মৃত্যুকে ঘিরে এখন স্থানীয়দের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, জনি প্যান্ট পরে বিল্লালের বাড়িতে গেলে মৃত্যুর সময় তার পরনে বিল্লালের লুঙ্গি কেন ছিল, তাকে কে এবং কী কারণে বিল্লালের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল, ঘটনার সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, জনির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত ব্যাগটির কী হয়েছিল, তার মোবাইল ফোনে মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, ইব্রাহীম ঘটনার পর কোথায় গেলেন, বিল্লালের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয়দের দাবির যে অসঙ্গতি রয়েছে, তার প্রকৃত কারণ কী, জনি অসুস্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নিতে কতটা সময় লেগেছিল, সর্বোপরি, এটি কি অসুস্থতাজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে?
এসকে মাল্টিমিডিয়া থেকে প্রকাশিত "প্রতিদিনের নিউজ ডটকম" হেড অফিস: ৫৩/এ নয়া পল্টন এক্সটেনশন রোড ঢাকা-১২০০। মোবাইল ০১৯৩০ ১৭২ ৫২০, ০১৩১৪ ১৬৮ ৬৪৪ । আঞ্চলিক অফিস: হাজী রজ্জব আলী সুপার মার্কেট (নিচ তলা) চিটাগাংরোড, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। Email:protidinernews24@gmail